আজ সারাবিশ্বে আমাদেরই ক্ষুদ্রঋণের জয়জয়কার। ক্ষুদ্র ঋণ বাংলাদেশে শান্তির স্বর্গ রচনা করেছে আর বিশ্বের জন্য শান্তির মডেল সৃষ্টি করেছে। তাই ক্ষুদ্র ঋণের প্রবক্তা হিসেবে ড. ইউনুস ও তাঁর গ্রামীণ ব্যাংক শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়ে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছেন যে ‘আমরাও পারি’। এ ক্ষুদ্র ঋণের কল্যাণেই এই দারিদ্রক্লিষ্ট বাংলাদেশ সারা বিশ্বের কাছে এক অনুসরনীয় মডেল হয়ে উঠেছে, একি কম পাওয়া !

ক্ষুদ্রঋণ দানকারী এনজিওদের দাবী ক্ষুদ্র্ঋণ সহায়সম্বলহীন হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। অর্থের জন্য এখন আর তাদের মুনাফাখোর মহাজনের কুটচালে পড়ে সর্বশান্ত হতে হয় না। সহজশর্তে, বিনা জামানতে সম্বলহীন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে ঋণ সেবা পৌছে দিয়ে আসছে এনজিওগুলো মাত্র ১৫% সেবামূল্যে। এনজিওদের আরও দাবী, এই ঋণ নিয়ে মানুষের ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে, দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে, দারিদ্র বিমোচন হচ্ছে। মানুষের কুড়েঘর টিনের ঘরে রূপান্তরিত হচ্ছে, বাড়িতে টিউবওয়েল বসছে, স্যারিটারী ল্যাট্রিন হচ্ছে, নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে – এসব্ই উন্নয়নের নির্দেশক।

কিন্তু মুদ্রার উল্টাপিঠের চিত্র অন্য কথা বলে। গবেষকদের হিসেব মতে চক্রবৃদ্ধি হারে ১৫% সেবামূল্য প্রকৃতপক্ষে বছরে ৪৫% ছাড়িয়ে যায় যেখানে ব্যাংকগুলো পুঁজিপতি, শিল্পপতিদেরকে ঋণ দেয় মাত্র ১০-১২% সুদে। এত চড়া সুদে ঋণ নিয়ে হতদরিদ্র মানুষের আয় কিভাবে বা কতটুকু বাড়ছে রীতিমত গবেষণার বিষয়। তাছাড়া, এই ঋণ নিয়ে একজন মানুষ যে কাজেই বিনিয়োগ করুকনা কেন ঋণ নেওয়ার পরের সপ্তাহ থেকে সত্যিই কি তার এমন আয় হতে থাকে, যে আয় দিয়ে তার কিস্তির টাকা শোধ করতে পারে? তাহলে, এই টাকা সে কোথা থেকে পায়? একজন লোক যদি ৫০০০ টাকা ঋণ নেয় তবে তাকে পরের সপ্তাহ থেকে ১৩৫ টাকা করে কিস্তি দিতে হয়। ধরা যাক, এই টাকা দিয়ে সে একটা গরু কিনল যে গরু হয়ত ছয়মাস থেকে এক বছর পরে বিক্রয় করবে। এই গরু বিক্রয় করার পূর্ব পর্যন্ত এই টাকা সে কোথা থেকে শোধ করবে। একটি হতদরিদ্র পরিবারের আয় দিয়ে তার সংসার ঠিকমত চলেনা বলেই সে হতদরিদ্র। তাহলে, তার ঘাড়ে এই যে বাড়তি কিস্তির বোঝা সে কি করে বহন করে? তদুপরি বাস্তব সত্য এই যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হতদরিদ্র মানুষ এই ঋণের টাকা নিয়ে খাবার কিনে, কাপড়-চোপড় কিনে, ঘরের চালের টিন কিনে, মেয়ের বিয়ে দেয় অর্থাৎ এই ধরণের অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করে যেখান থেকে তার বাড়তি কোন আয় হয়না। তাহলে, সেই ব্যক্তি যখন ঋণের এই টাকা ফেরত দেয় তখন তার অন্য কোন খাতের আয় থেকে বা পারিবারিক কোন সম্পদ বিক্রী করেই এই টাকা শোধ করতে হয়। তাছাড়া, বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে ঋণদানকারী এনজিওর অভাব নেই। একজন ব্যক্তি একের পর এক ঋণ দেয় ফলে, এই ঋণ তার দারিদ্র বিমোচন না করে বরং দারিদ্র বৃদ্ধি করছে।

ক্ষুদ্র ঋণের গ্রামীণ ব্যাংকের মডেল যেভাবে শুরু হয়েছিল সেভাবে যদি এটা বাস্তবায়িত হত তাহলে সত্যিকারভাবেই হয়ত মানুষ লাভবান হত। কারণ, শুরুতে ক্ষুদ্র ঋণের পাশাপাশি এনজিও কর্মীরা দলগঠন করে তাদের দক্ষতা উন্নয়ন করে দক্ষতার ভিত্তিতে ঋণ দিত যাতে আয়বর্ধক কোন ্প্রকল্প হাতে নিতে পারে। তাছাড়া, এই প্রকল্প সফল বাস্তবায়নের জন্য কর্মীরা মাঠপর্যায়ে সহযোগিতা প্রদান করত। কিন্তু এই সিস্টেম বেশিদিন টিকে থাকেনি। কারণ, এনজিওগুলো এই ক্ষৃদ্রঋণ কার্যক্রমকে সেবা থেকে ব্যাংকিং ব্যবসায় পরিণত করেছে। এই ব্যবসায় দরিদ্র মানুষের যতটা না কল্যাণ হচ্ছে এনজিওগুলোর নিজেদের কল্যাণ তার চেয়ে বেশি হচ্ছে বলেই মনে হয়। তাই সাবেক অর্থমন্ত্রী জনাব ছাইফুর রহমান মাঝে মধ্যে বক্রস্বরে বলতেন যে, এনজিওরা ঋণের ব্যবসা ফেঁদে রকফেলারের মত আকাশচুম্বি অট্টালিকা গড়ে তুলছে, রাতারাতি ফুলে ফেপে উঠছে। শুধু সাবেক অর্থমন্ত্রীই নয়, বিষয়টি যেকোন সচেতন মানুষের কাছেই বোধগম্য। ক্ষুদ্র ঋণের কুশীলবরা আজ শুধু আকাশচুম্বি অট্টালিকাই গড়ে তুলছেনা, বহুজাতিক কোম্পানির আদলে গড়ে তুলছে নানা ধরণের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

আমি বলি, মাননীয় মন্ত্রীমহোদয়, উন্নয়নের খেলায় মিলেনিয়াম গোল করতে গিয়ে আপনিতো গলধঘর্ম হচ্ছেন; পরিসংখানের খাতায় কাটাকুটি করেও দরিদ্রের সংখ্যাটা ৫০ ভাগের নীচে নামিয়ে আনতে পাচ্ছেন না। সেই হতদরিদ্র, কপর্দকশূণ্য মানুষ যাদেরকে আপনার ব্যাংকওয়ালারা পায়েও মাড়ায়না তাদেরকে ধুলো-কাঁদা মাখা অজপাড়াগায়ে সেবা দিই বলে আমাদের কী সাধ জাগেনা একটু আকাশ ছুয়ে দেখার। আর তাতেই আপনার চোখ টাটাচ্ছে।

আবার ঐ সাংবাদিক জাতটা একবারে টেরা চোখা, সবকিছু দেখে বাঁকাচোখে। ওঁরা প্রায়ই লেখে, আমরা নাকি বন্যা-খরা, বাঁচা-মরা কিছুই মানি না, বর্গীর মতো হামলে পড়ি ঋণের কিস্তি আদায়ের জন্য। বলি কি দাদা, লেখাটা খুব সোজা, কলম চালালেই লেখা হয়ে যায়। আসুন না একবার দেখুন না ক্ষুদ্রঋণ চালিয়ে, কেমন ঠেলা। নিঃস্ব আকিঞ্চিতকর মানুষগুলোকে টাকা দিয়ে ৯৫-১০০% রিকভারি, একি চাট্টিখানি কথা। টাকা বলে কথা, কেউ কি দেয় সহজে? তাইতো একটু আঙ্গুলটা বাঁকা করতেই হয়।

মনে কেমন যেন খটকা লাগে এই ভেবে যে, ধনী বিশ্বেতো আমাদের ক্ষুদ্রঋণের মডেলের কার্যকারিতা বা প্রয়োজনীয়তা কোনটাই নেই তবে আজ আমাদের ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে সারা বিশ্বে বিশেষ করে ধনী দেশগুলোতে এত মাতামাতি চলছে কেন। এ প্রশ্নের জবাবটা আমার ক্ষুদ্র মস্তিস্কে কিছুতেই আসছে না। এই ক্ষুদ্রঋণ আমাদের দারিদ্র মোচন করে দিবে, একি সেজন্যই? মনে ঘোর সন্দেহ জাগে কারণ, ১৯৯৭ সালের ক্ষুদ্রঋণ সম্মেলন আয়োজনে টাকা ঢেলেছে বিশ্বে কৃষি ব্যবসায় দুষ্ট কোম্পানি হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে থাকা বহুজাতিক কোম্পানি মোনসান্টো। কেন!!! কারণ, ঐ সম্মেলনে মোনসান্টো গ্রামীন ব্যাংকের সাথে ৩৫০ কোটি ডলার ঋণের বিনিময়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। শর্ত ছিল, গ্রামীন ব্যাংক তার কৃষক সদস্যদের মধ্যে মোনসান্টো কোম্পানির প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিবে। আমাদের সৌভাগ্য যে, দেশের পরিবেশবাদীদের চাপে ড. ইউনুস চুক্তি থেকে নিবৃত হন।

আমাদের উন্নয়নের ভাবনায় ধনী দেশের ঘুমহারাম অবস্থা, অথচ এইতো গত ডিসেম্বরে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার হংকং মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে আমরা বর্তমানে এদেশের অর্তনীতির প্রাণপঙ্ক হয়ে উঠা পোষাক শিল্পকে বাঁচাতে আমেরিকার বাজারে আমাদের তৈরি পোষাকের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার চেয়েছিলাম (যা আমাদের ন্যায্য দাবিও বটে), কিন্তু অন্যসব গরীব দেশকে এ সুযোগ দেয়া হলেও বাংলাদেশকে দেয়া হয়নি। তাই ঘরপোড়া গরুর মতই ভয় হয় ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে এত মাতামাতি-এ আবার কোন দুরভিসন্ধি কি-না।

দুরভিসন্ধিতো অবশ্যই আছে। চৌদ্দ কোটি মানুষের এ দেশের বাজার, অথচ অর্ধেকেরও বেশী মানুষের বাস দরিদ্র সীমার নীচে। কাজেই এ বাজারে ব্যবসা করতে হলে এদের হাতে অর্থ তুলে দিতে হবে, বাড়াতে হবে ক্রয় ক্ষমতা। তা না হলে নিমের ডাল ছেড়ে ক্লোজ-আপ, সর্ষের তেল ছেড়ে সোয়াবিন আর ফেয়ার এন্ড লাভলি কিনবে কি করে। এই ক্ষুদ্র ঋণের পুরোধা গ্রামীন ব্যাংকের হাত ধরেই দরিদ্র মানুষের কাছে অত্যাধুনিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা মোবাইল ফোন পৌছে দেয়ার বাহারি প্রকল্প নিয়ে এসেছিল নরওয়ের মোবাইল কোম্পানি ইউনিনর যা আমরা দীর্ঘদিন যাবৎ জানতেই পারিনি। ভেবেছি, এটা আমাদের গ্রামীন ব্যাংকেরই কারিশমা। অথচ একটি হতদরিদ্র দেশের দরিদ্র মানুষগুলোর কাছ থেকে অবলীলায় সাত টাকা মিনিট কলচার্য নিয়ে যাচ্ছে যা আমাদের প্রতিবেশি দেশেই মাত্র ৫০/৬০ পয়সা। মাতামাতি কি এমনিতেই।

ক্ষুদ্র্ঋণ মডেল আমিও সমর্থন করি, তবে তা হতে হবে সেই গরীব মানুষদেরই নিয়ন্ত্রণে, নব্য মহাজনদের নয়। পাল্টে দিতে হবে এই নব্য মহাজনি সিস্টেম। চালু করতে হবে দরিদ্র জনগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত ক্ষুদঋণ ব্যবস্থা।

কৃষিবিদ শহীদুল ইসলাম
নির্বাহী পরিচালক, উন্নয়ন ধারা
(২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্রঋণ বর্ষ উপলক্ষে লেখা)

 

Comments

Share This