হরিপদ কাপালীর হরিধান এবং উন্নয়ন ধারার উদ্যোগ

হরিপদ কাপালীর হরিধান এবং উন্নয়ন ধারার উদ্যোগ

নিজের আবিষ্কৃত হরিধান বুকে ধরে হাস্যোজ্জ্বল হরিপদ কাপালী

১৯৯৯ সালের কথা। ঝিনাইদহ জেলার সদর উপজেলার হলিধানী ইউনিয়নের আসাননগর গ্রামের ক্ষুদ্র কৃষক হরিপদ কাপালী একদিন যখন তাঁর আমন ধানের জমিতে আগাছা নিড়াচ্ছিলেন তখন একটি ধানের গোছা তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করে। তিনি লক্ষ করেন যে গোছাটি অন্যসব গোছা থেকে আলাদা। গোছাটি যেমন অন্যসব গোছা থেকে অনেক লম্বা তেমনি বৃদ্ধিও অনেক বেশি। তিনি অন্যান্য ভেজাল ধানের মত গোছাটি তুলে না ফেলে চোখে চোখে রাখলেন এবং সবাইকে সতর্ক করে দিলেন যাতে সেটি কেউ তুলে না ফেলে। এভাবে একসময় গোছাটি চকচকে সোনালি ধানে ভরে উঠল। তিনি ধানগুলো আলাদা করে তুলে রাখলেন। পরের আমন মৌসুমে সেই একমুঠো ধান বীজ তলায় আলাদাভাবে ফেললেন এবং তা থেকে যে চারা হল তা আলাদভাবে একখন্ড জমিতে লাগালেন। এই ধান যখন ফললো তখন তিনি এবং গ্রামের অন্যান্য কৃষকগণ লক্ষ করলেন যে বিআর১১ ধানের সাথে কিছুটা মিল থাকলেও জাতটি আলাদা। এ ধানের গাছ যেমন অন্যসব জাতের চেয়ে অনেক লম্বা তেমনি শীষের দৈর্ঘ্য, দানার গাথুনি, ধানের রং সবই নজরকাড়া। এবারও হরিপদ কাপালী এই ধানটুকু আলাদাভাবে তুলে রাখলেন এবং পরবর্তী আমন মৌসুমে আলাদাভাবে প্রায় ১ বিঘা জমিতে লাগালেন। এবারও এ ধান গ্রামের অন্যান্য কৃষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সবাই জানতে চাইল এ ধানের নাম এবং জাতটি তিনি কোথায় পেলেন। কিন্তু কি নাম বলবেন, তাঁর এ নবজাতকের নামতো তিনি নিজেও জানেন না। নাম যাই হোক, তাঁর এই ধান নেওয়ার জন্য গ্রামে কাড়াকড়ি পড়ে গেল। নিজের জমিতে লাগানোর জন্য সামান্য ধান রেখে বাকী ধান বদল করে দিতে হল গ্রামের অন্যান্য কৃষকদেরকে। এভাবেই শুরু হরিধানের বিস্তার। মানুষের মুখে মুখে নাম না জানা এ ধানের নাম ছড়িয়ে পড়ল হরিধান নামে।

হরিধানের জনক হরিপদ কাপালী কি একজন আবিষ্কারক ছিলেন? প্রশ্নটা আসছে এজন্য যে হরিধান আদৌ তাঁর কোন নতুন আবিষ্কার ছিল কি না তা নিয়ে উনার জীবদ্দশাতে অনেক বিতর্ক হয়েছিল। বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল মূলত আমাদের ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-এর বিজ্ঞানীগণ। উনাদের মতে হরিধান কোন নতুন জাত ছিল না। যেহেতু বিআর১১ জাতের জমি থেকে হরিপদ কাপালী এই জাতটি সংগ্রহ করেছিলেন কাজেই তাদের দাবি ছিল এটা বিআর১১-এর কোন উপজাত ছিল। যদিও তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীন বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. জেবা ইসলাম সিরাজ হরিধানের জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে এটাকে বিআর১১ থেকে আলাদা জাত হিসেবেই প্রমাণ করেছিলেন। অবশ্য এটাও সত্য যে, তখন কোন কোন মিডিয়া বা ব্যক্তি হয়তো একটু বাড়াবাড়িই করেছিলেন এবং অযাচিতভাবেই প্রাতিষ্ঠানিক ধান বিজ্ঞানীদের ইগোতে আঘাত লাগার মত কথাও বলেছিলেন। তাই হয়তো ধান বিজ্ঞানীগণ তখন হরিধানের অনেকটা বিপক্ষেই অবস্থান নিয়েছিলেন।

এটাই বাস্তবতা যে, ধানের আধুনিক উচ্চফলনশীল জাত কিংবা হাইব্রিড ও জেনেটিকেলি মডিফায়েড (জিএম) জাতের আবিষ্কার এবং নতুন জাত হিসেবে স্বীকৃতির বিষয়গুলো রাষ্ট্রীয় বা বৈশ্বিক নীতি-আইন অনুয়ায়ী একচ্ছত্রভাবে গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা কোম্পানীদের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে। যদিও আমরা জানি যে, এদেশে একসময় প্রায় ১২,৫০০ জাতের ধান চাষ হত। এসব জাতের বেশকিছু এখনও চাষ হয়ে থাকে। এসব জাতগুলোর কোন আবিষ্কারকের নাম কারও জানা নেই। কিংবা এগুলো কোন আবিষ্কার হিসেবেও স্বীকৃত নয়। বলা বাহুল্য এসব জাতের আবিষ্কারক কৃষকই। হাজার বছর ধরে কৃষকেরাই এসব জাতগুলোকে আবিষ্কার করেছেন, চাষ ও লালন করেছেন। এজন্য কোন কৃত্রিম প্রজনন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়নি। প্রকৃতিতে যুগ যুগ ধরে যে প্রাকৃতিক প্রজনন প্রক্রিয়া চলে আসছে এবং সেখান থেকে প্রাকৃতিক নিয়মে যে নতুন নতুন জাতের উদ্ভব ঘটেছে সেগুলোই নির্বাচনের মাধ্যমে (যা সিলেকশন পদ্ধতি হিসেবে উদ্ভিদ প্রজনন বিজ্ঞানে অদ্যাবধি বহুল ব্যবহৃত) চাষীরা নতুন জাত হিসেবে চাষ ও লালন করেছেন। এসব জাতকে কৃষকরা তাঁদের আবিষ্কৃত জাত হিসেবে দাবি করেননি কিংবা জাতগুলোকে নিজেদের কাছে কুক্ষিগত করে রাখার কথাও তাঁদের মাথায় আসেনি। প্রকৃতিতে জন্ম নেওয়া এবং প্রকৃতির নানাবিধ প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে খাপ খেয়ে এবং মানুষের নানামুখী আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পছন্দ মিটিয়ে শত-সহস্র বছর টিকে থাকার জন্য এই জাতগুলোর ছিল অসাধারণ ক্ষমতা। ষাটের দশক থেকে সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তির পুরোধা হিসেবে আসা উচ্চফলনশীল জাতগুলো কৃষকের সেইসব জাতগুলো থেকেই সৃষ্ট যা সেই মাতৃজাতগুলোকে কৃষকের মাঠ থেকে বিদায় দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি জিনব্যাংকে। এসব জাত থেকেই আজ নতুন নতুন উফশী, হাইব্রিড বা জিএম জাতগুলো উৎপাদিত হচ্ছে। আজ কোম্পানিগুলো বাজারে নিয়ে আসছে নতুন নতুন হাইব্রিড ও জিএম জাত যেগুলো পুনরায় বীজ হিসেবে ব্যবহারের ক্ষমতা কৃষকদের হাতে নেই। একসময় কৃষকের হাতে থাকা জাতগুলোই এসব জাতের উৎস হলেও এগুলোর একক মালিকানা এখন একমাত্র কোম্পানিগুলোর হাতেই থাকছে। উদাহরণস্বরূপ আমরা জানি বীজের মালিকানা কুক্ষিগত করার এরূপ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একসময় ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত জাত বাশমতির মালিক বনতে যাচ্ছিল রাইসটেক নামক বহুজাতিক কোম্পানি যা ভারত সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপের ফলে শেষ পর্যন্ত হতে পারেনি। যাহোক, হরিধান ছিল একটি উচ্চফলনশীল জাত। কৃষক কোন উচ্চফলনশীল জাত আবিষ্কার করতে পারেন এটা বিজ্ঞানীদের পক্ষে বিশ্বাস করা সত্যি কঠিন। কারণ কোন বৈজ্ঞানিক ব্রিডিং জ্ঞান ও দক্ষতা ছাড়া কৃষকের পক্ষে আধুনিক উচ্চফলনশীল জাত আবিষ্কার করা বিষ্ময়কর বৈকি!

হরিধান যখন আবিষ্কৃত হল তখন বিশ্বব্যাপী কৃষকের বীজ অধিকারের দাবিটি তুঙ্গে। ইতোমধ্যে কৃষি বাণিজ্যের পুরোধা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মদদে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় ট্রিপস (ট্রেড রিলেটেড আসপেক্টস অব ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস) চুক্তিটি গৃহীত হয়েছে, গৃহীত হয়েছে কৃষিচুক্তিও (এগ্রিমেন্ট অন এগ্রিকালচার)। মূলত এই দুটি চুক্তিকে ঘিরেই তখন আবর্তিত হচ্ছিল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দোহা রাউন্ডের আলোচনা। নতুন জাত আবিষ্কারের নামে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তখন বীজের মালিকানা কুক্ষিগত করার পক্ষে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার আলোচনাকে প্রভাবিত করতে তৎপর। টার্মিনেটর প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোনসান্টো নামক আমেরিকান কোম্পানি কৃষকের মাঠের জাতগুলোকে হটিয়ে দিয়ে সেই কোম্পানির বীজের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারে মত্ত। এসব বীজের মাধ্যমে হাজার বছরের কৃষির মালিকানা কৃষকের হাতছাড়া হবার উপক্রম। এর বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী তখন চলছে তীব্র্র প্রতিবাদ। কৃষকের অধিকার নিয়ে সোচ্চার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, পরিবেশবাদী গ্রুপ এবং কৃষক সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ, প্রচারাভিযান, অধিপরামর্শ দোহা রাউন্ডের আলোচনায় কোম্পানির স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে বিলম্বিত করতে যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। সঙ্গত কারণে তখন উন্নয়ন ধারাও এই প্রতিবাদের সাথে একাত্ম হয়েছিল। এমনি এক মুহূর্তে হরিধানের আবিষ্কার বীজের উপর কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিকে সংহত করতে যথেষ্ট সহায়ক হয়েছিল। কাজেই হরিধানের আবিষ্কার উন্নয়ন ধারার কাছে নিছক একটি জাতের আবিষ্কার ছিল না।

মূলত ২০০৩ সাল থেকে উন্নয়ন ধারা হরিধান নিয়ে কাজ করা শুরু করে। যেহেতু বীজ ও কৌলিক সম্পদের উপর কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে এবং হাজার বছর ধরে কৃষকের আবিস্কৃত ও লালিত স্থানীয় জাতগুলোর সংরক্ষণের গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে সংস্থা স্থানীয় জাতের চাষ করতে কৃষকদেরকে উৎসাহিত করে আসছিল, সেহেতু হরিধানের আবিষ্কারকে উন্নয়ন ধারা একটি আশীর্বাদ হিসেবেই গ্রহণ করেছিল। স্থানীয় জাতসমূহের ফলন কম হওয়ায় কৃষককে সেসব জাতের ধান চাষে উৎসাহিত করা ছিল একটি দুরূহ কাজ। কারণ ইতোমধ্যে কৃষক উচ্চ ফলন দেখে উফশী এমনকি হাইব্রিড ধান চাষে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ব্রি আবিষ্কৃত উচ্চ ফলনশীল জাতগুলো চাষের ব্যাপারে উন্নয়ন ধারা কখনই কৃষককে নিরুৎসাহিত করেনি বরং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা আর ক্রমহ্রাসমান আবাদী জমির বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে সংস্থা কৃষককে উফশী জাতের ধান চাষে উৎসাহিত করে আসছে। কারণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রি কর্তৃক উদ্ভাবিত জাতগুলোর মালিকানা ব্রি’র কাছেই আছে বিধায় তা প্রকান্তরে কৃষকের কাছেই আছে বলে সংস্থা মনে করে। তাছাড়া, কৃষক এই জাতগুলো থেকে বীজ রেখে চাষ করতে পারে। কিন্তু এই জাতগুলো উৎপাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রে কোম্পানি ও ব্যবসায়ীদের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং বীজে ভেজাল দেওয়া, অতিরিক্ত মূল্য নেওয়া, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফা করা ইত্যাদি নানাবিধ সংকট থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় হিসেবে তখন সংস্থা ব্রি’র উদ্ভাবিত জাতগুলো কৃষক পর্যায়ে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল যা এখনও চলমান। যাহোক, বিআর১১ ও ব্রি ধান৩৩ ছাড়া তখন ঝিনাইদহ অঞ্চলে আমন মৌসুমে আর তেমন কোন ভাল জাত ছিল না। কিন্তু ঐসময় বিআর১১ জাতের দুর্দিন যাচ্ছিল। কৃষকরা এই জাত চাষ করে অধিকহারে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কিংবা অজ্ঞাত সমস্যার কারণে যথেষ্ট ফলন পাচ্ছিলেন না। এমন প্রেক্ষাপটে সেসময় ভারতীয় জাত স্বর্ণা ঝিনাইদহ এলাকায় ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করছিল। এমতাবস্থায় হরিধানের ফলন আমন মৌসুমের উক্ত উফশী জাতগুলোর (যেমন: বিআর১১, স্বর্ণা ইত্যাদি) সমতুল্য হওয়ায় এবং হরিধানের অন্যকিছু বৈশিষ্ট্য সমসাময়িক অন্যান্য জাতের চেয়ে ভাল হওয়ায় কৃষককে এ ধান চাষে উৎসাহিত করা যেমন সহজতর তেমনি কার্যকরীও হয়েছিল।

যাহোক, ২০০৩ সালে সংস্থা প্রথমে এই জাতের বীজ সংগ্রহ করে নিজস্ব গবেষণা মাঠে এর বিআর১১ ও ব্রি ধান৩৩ জাতের সাথে হরিধানের একটি তুলনামূলক পরীক্ষা করে ভাল ফলাফল পায়। পরের বছর ২০০৪ সালের আমন মৌসুমে উন্নয়ন ধারা ঝিনাইদহ সদর উপজেলাধীন কর্ম এলাকার পাঁচটি গ্রামের (মধুপুর, বিজয়পুর, কাষ্টসাগরা, আড়ুয়াকান্দি ও ঘোড়ামারা) কিছু কৃষককে প্রদর্শনীর জন্য হরিধানের বীজ প্রদান করে। স্মরণ করা যেতে পাওর যে, প্রথমে হরিধান নামক এক অজানা ও অখ্যাত এবং একজন কৃষকের আবিষ্কৃত এ জাতটি চাষ করতে ওই নতুন এলাকার কৃষকের মধ্যে তেমন কোন আগ্রহ দেখা যায় নি। হরিধানের গুণাগুণ সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদানের পর প্রায় ৫০ জন কৃষক এ ধান চাষে উৎসাহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত ৪২ জন কৃষক হরিধান রোপন করে। পাশাপাশি সংস্থা মধুপুর গ্রামের কৃষকদের নিয়ে একটি কর্মগবেষণা কার্যক্রমও পরিচালনা করে যার প্রধান লক্ষ্য ছিল কৃষকের মাঠে আমন মৌসুমের অন্যান্য জাতের সাথে হরিধানের তুলনামূলক পারফরম্যান্স যাচাই করা। একই বছরে সংস্থা হরিধানের জন্মস্থান অর্থাৎ আসাননগর গ্রামে এ ধানের জনক হরিপদ কাপালীসহ গ্রামের ২৫ জন কৃষককে নিয়ে একটি কৃষক মাঠ স্কুল পরিচালনা কওর – যেখানে “জৈব পদ্ধতিতে হরিধান চাষ” বিষয়ক একটি কর্মগবেষণা পরিচালনা করা হয়। অতঃপর সংস্থা ২০০৫, ২০০৬ ও ২০০৭ সালে ঝিনাইদহ, শৈলকুপা, কোটচাঁদপুর ও কালিগঞ্জ উপজেলার ২৮ টি গ্রামের প্রায় ৫০০ কৃষককে হরিধানের বীজ প্রদান করে। কৃষকের মাধ্যমে এ বীজ তখন হাজারো কৃষকের মাঝে পৌছে গিয়েছিল।

২০০৮ সালে সংস্থা সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার “ফসল” প্রকল্পভূক্ত কৃষকদের নিয়ে একটি কর্মগবেষণা পরিচালনা করে। তখন ঐ অঞ্চলেও কৃষকদের মাঝে হরিধান বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তখন হরিধানের বেশ চাহিদা সৃষ্টি হওয়ায় সংস্থা উন্নতমানের বীজ উৎপাদন কার্যক্রমের মাধ্যমে হরিধানের বীজ উৎপাদন করে ঝিনাইদহ ও রংপুর অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করে। সম্ভবত রংপুর অঞ্চলে তখন হরিধান সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ঝিনাইদহে যখন হরিধানের বীজ ২০-২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হত তখন রংপুর অঞ্চলে সে বীজের দাম উঠেছিল কেজিপ্রতি ৫০-৬০ টাকা পর্যন্ত।

যাহোক উন্নয়ন ধারা কর্তৃক পরিচালিত কর্মগবেষণায় হরিধানের যেসব বৈশিষ্ট্য পর্যক্ষেণ করা হয় সেগুলো ছিল নিন্মরূপ:

১.    হরিধানের গড় ফলন রেকর্ড করা হয় ৫.৬ টন/হেক্টর যা আমন মৌসুমের অন্যান্য উচ্চফলনশীল জাতের সমতুল্য

২.    বিরূপ প্রাকৃতিক অবস্থা যেমন: বন্যা ও খরায় এ জাতের যথেষ্ট সহনশীলতা লক্ষ করা যায়

৩.   এ জাতে সারের চাহিদা অন্যান্য জাত থেকে বেশ কম ছিল বলে মাঝারি উর্বর জমি যেখানে অন্যান্য আমন ধানের জাত ভাল ফলন দেয় না সেসব জমিতেও হরিধান ভাল ফলন দেয়

৪.    এ জাতে পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ অন্যান্য জাতের তুলনায় অনেক কম লক্ষ করা যায়

৫.    হরিধানের খড় অনেক লম্বা এবং আকর্ষনীয় যা বিশেষ করে বিচালি হিসেবে অন্যান্য জাতের বিচালির তুলনায় দেড়গুণেরও বেশি দামে কৃষক বিক্রি করে। অন্যদিকে, হরিধানে খড় অন্যান্য জাত থেকে অনেক বেশি পাওয়া যায় যা পশুখাদ্য, ঘরের চালা তৈরি ও অন্যান্য কাজের জন্য খুব ভাল

৬.   হরিধানের ভাত বিশেষ করে মুড়ি বিশেষ আকর্ষনীয়

৭.    হরিধানের রঙ চকচকে সোনালি যা ক্রেতাকে আকৃষ্ট করে ফলে এর বাজারমূল্যও ভাল পাওয়া যায়

হরিধানকে একটি নতুন জাত হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি তখন বিভিন্ন মহল থেকেই উঠেছিল। কিন্তু তা হয়নি। অবশ্য এক্ষেত্রে বেশকিছু প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতাও ছিল। কারণ কোন কৃষক কোন নতুন উফশী জাত উদ্ভাবন করবেন আর তা জাত হিসেবে নিবন্ধন দিতে হবে এমন ভাবনাই হয়তো জাতীয় বীজনীতি বা বীজবোর্ডের ছিল না। যাহোক, হরিধান জাতীয় বীজবোর্ড কর্তৃক স্বীকৃত কোন জাত হোক বা না হোক হরিধান একটি নতুন জাত হিসেবেই সেসময় কৃষকের কাছে সমাদৃত হয়েছিল। আর কৃষকের মুখে মুখে তা হরিধান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। পরে মিডিয়ার কল্যাণে তা সারাদেশের কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছিল।

নতুন জাত হিসেবে প্রতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পাওয়ায় হরিপদ কাপালীকে কোনদিন আক্ষেপ করতে শুনিনি। উনার সাথে যতবার কথা হয়েছে প্রতিবারই তিনি একটি কথাই বলেছেন যে তাঁর জাত যে ঝিনাইদহসহ সারাদেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকগণ চাষ করে উপকৃত হচ্ছেন এটাই তাঁর কাছে ছিল পরম প্রশান্তির ব্যাপার। একবার যখন তাঁর সাথে কথা হচ্ছিল তিনি বলছিলেন, কেউ একজন নাকি তাঁকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে হরিধানকে নতুন জাত হিসেবে ছাড় করিয়ে দেবেন। সেই ব্যক্তি নাকি তাঁকে এরূপ প্রস্তাবও দিয়েছিলেন যে, জাত হিসেবে নিবন্ধন লাভের পর হরিধানের বীজ সেই প্রতিষ্ঠান (সম্ভবত কোন বীজ ব্যবসায়ি) উৎপাদন ও বিক্রী করবে এবং বিনিময়ে হরিপদ কাপালীকে তারা টাকাও দেবে। সেসময় যে কতরকম ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাঁর কাছে আসত এবং নানাবিধ প্রস্তাবনা দিত। তাঁর সাথে কথা বলে মনে হয়েছিল কেউ হয়তো তাঁর জাতটাকে প্যাটেন্ট করারও উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আমি তখন তাঁকে যখন বুঝিয়ে বললাম প্যাটেন্ট বিষয়টা কি এবং এই জাতের প্যাটেন্ট করা হলে তিনি হয়তো আর্থিকভাবে লাভবান হবেন কিন্তু এখন যেভাবে যেকোন কৃষক নিজেরাই বীজ রেখে অবাধে চাষ করছেন তেমনটা তখন করতে পারবেন না এবং প্রশ্ন রেখেছিলাম যে তিনি সেটা চান কিনা? তখন স্বভাবজাত সরল হাসি হেসে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উত্তর দিয়েছিলেন না, তিনি তা চান না। তিনি বলেছিলেন যত কৃষক এই জাত চাষ করবে ততই তিনি খুশি হবেন। আমি প্রশ্নটা করেছিলাম প্যাটেন্টের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যের বিপরীতে তাঁর মনোভাবটা বুঝার জন্য। তাঁর এরূপ উত্তরে আমি তখন একদিকে আবেগাপ্লুত হয়েছিলাম এটা জেনে যে তিনি টাকার জন্য কৃষকদেরকে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চান না। অন্যদিকে আশ্বস্তও হয়েছিলাম যে দারিদ্রক্লিষ্ট এই মানুষটি টাকার কাছে বিক্রি হবেন না, যা আমাদের মত মানুষেরা হই অবলীলায়।

হরিধান আজ বেশি একটা চাষ হচ্ছে না। হবার কথাও নয়। হরিধান তখন কৃষকরা গ্রহণ করেছিল উফশী জাত হিসেবেই। আর উফশী জাতের টিকে থাকার জন্য প্রচলিত অন্যান্য উফশী জাতের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাটা জরুরি। ইতোমধ্যে আমন মৌসুমে বেশকিছু অধিকতর ভাল জাত এসেছে। আর হরিধানের সূতিকাগার ঝিনাইদহে চলছে লালস্বর্ণা, গুটিস্বর্ণা, বাবুস্বর্ণা ইত্যাদি নামে বেশকয়টি ভারতীয় জাতের আধিপত্য। বিনাধান-৭, ব্রি ধান৩৯, ব্রিধান৪৯ এগুলোর চাষও বেড়েছে প্রধানত এগুলোর চাল সরু হওয়ার কারণে। অন্যদিকে, বীজের কৌলিক গুণাগুণ অক্ষুন্ন রেখে টিকে থাকার জন্য এ জাতের যেহেতু ব্রিডার বীজ পাওয়ার কোন সুযোগ ছিল না তাই এই জাতের পক্ষে টিকে থাকার কথাও নয়। এটা জাত হিসেবে স্বীকৃত হলে এবং সরকারিভাবে এর কৌলিক বিশুদ্ধতা বজায় রাখার উদ্যোগ নিলে হয়তো জাতটি টিকে থাকতে পারতো। হরিধান টিকে থাকুক বা না থাকুক হরিধানের জনক হরিপদ কাপালী কৃষকের অন্তরে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।

লেখক: কৃষিবিদ শহীদুল ইসলাম, নির্বাহী পরিচালক, উন্নয়ন ধারা

৬ জুলাই ২০১৭ তারিখে হরিপদ কাপালীর মহাপ্রয়াণ স্মরণে

ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে

ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে

আজ সারাবিশ্বে আমাদেরই ক্ষুদ্রঋণের জয়জয়কার। ক্ষুদ্র ঋণ বাংলাদেশে শান্তির স্বর্গ রচনা করেছে আর বিশ্বের জন্য শান্তির মডেল সৃষ্টি করেছে। তাই ক্ষুদ্র ঋণের প্রবক্তা হিসেবে ড. ইউনুস ও তাঁর গ্রামীণ ব্যাংক শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়ে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছেন যে ‘আমরাও পারি’। এ ক্ষুদ্র ঋণের কল্যাণেই এই দারিদ্রক্লিষ্ট বাংলাদেশ সারা বিশ্বের কাছে এক অনুসরনীয় মডেল হয়ে উঠেছে, একি কম পাওয়া !

ক্ষুদ্রঋণ দানকারী এনজিওদের দাবী ক্ষুদ্র্ঋণ সহায়সম্বলহীন হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। অর্থের জন্য এখন আর তাদের মুনাফাখোর মহাজনের কুটচালে পড়ে সর্বশান্ত হতে হয় না। সহজশর্তে, বিনা জামানতে সম্বলহীন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে ঋণ সেবা পৌছে দিয়ে আসছে এনজিওগুলো মাত্র ১৫% সেবামূল্যে। এনজিওদের আরও দাবী, এই ঋণ নিয়ে মানুষের ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে, দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে, দারিদ্র বিমোচন হচ্ছে। মানুষের কুড়েঘর টিনের ঘরে রূপান্তরিত হচ্ছে, বাড়িতে টিউবওয়েল বসছে, স্যারিটারী ল্যাট্রিন হচ্ছে, নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে – এসব্ই উন্নয়নের নির্দেশক।

কিন্তু মুদ্রার উল্টাপিঠের চিত্র অন্য কথা বলে। গবেষকদের হিসেব মতে চক্রবৃদ্ধি হারে ১৫% সেবামূল্য প্রকৃতপক্ষে বছরে ৪৫% ছাড়িয়ে যায় যেখানে ব্যাংকগুলো পুঁজিপতি, শিল্পপতিদেরকে ঋণ দেয় মাত্র ১০-১২% সুদে। এত চড়া সুদে ঋণ নিয়ে হতদরিদ্র মানুষের আয় কিভাবে বা কতটুকু বাড়ছে রীতিমত গবেষণার বিষয়। তাছাড়া, এই ঋণ নিয়ে একজন মানুষ যে কাজেই বিনিয়োগ করুকনা কেন ঋণ নেওয়ার পরের সপ্তাহ থেকে সত্যিই কি তার এমন আয় হতে থাকে, যে আয় দিয়ে তার কিস্তির টাকা শোধ করতে পারে? তাহলে, এই টাকা সে কোথা থেকে পায়? একজন লোক যদি ৫০০০ টাকা ঋণ নেয় তবে তাকে পরের সপ্তাহ থেকে ১৩৫ টাকা করে কিস্তি দিতে হয়। ধরা যাক, এই টাকা দিয়ে সে একটা গরু কিনল যে গরু হয়ত ছয়মাস থেকে এক বছর পরে বিক্রয় করবে। এই গরু বিক্রয় করার পূর্ব পর্যন্ত এই টাকা সে কোথা থেকে শোধ করবে। একটি হতদরিদ্র পরিবারের আয় দিয়ে তার সংসার ঠিকমত চলেনা বলেই সে হতদরিদ্র। তাহলে, তার ঘাড়ে এই যে বাড়তি কিস্তির বোঝা সে কি করে বহন করে? তদুপরি বাস্তব সত্য এই যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হতদরিদ্র মানুষ এই ঋণের টাকা নিয়ে খাবার কিনে, কাপড়-চোপড় কিনে, ঘরের চালের টিন কিনে, মেয়ের বিয়ে দেয় অর্থাৎ এই ধরণের অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করে যেখান থেকে তার বাড়তি কোন আয় হয়না। তাহলে, সেই ব্যক্তি যখন ঋণের এই টাকা ফেরত দেয় তখন তার অন্য কোন খাতের আয় থেকে বা পারিবারিক কোন সম্পদ বিক্রী করেই এই টাকা শোধ করতে হয়। তাছাড়া, বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে ঋণদানকারী এনজিওর অভাব নেই। একজন ব্যক্তি একের পর এক ঋণ দেয় ফলে, এই ঋণ তার দারিদ্র বিমোচন না করে বরং দারিদ্র বৃদ্ধি করছে।

ক্ষুদ্র ঋণের গ্রামীণ ব্যাংকের মডেল যেভাবে শুরু হয়েছিল সেভাবে যদি এটা বাস্তবায়িত হত তাহলে সত্যিকারভাবেই হয়ত মানুষ লাভবান হত। কারণ, শুরুতে ক্ষুদ্র ঋণের পাশাপাশি এনজিও কর্মীরা দলগঠন করে তাদের দক্ষতা উন্নয়ন করে দক্ষতার ভিত্তিতে ঋণ দিত যাতে আয়বর্ধক কোন ্প্রকল্প হাতে নিতে পারে। তাছাড়া, এই প্রকল্প সফল বাস্তবায়নের জন্য কর্মীরা মাঠপর্যায়ে সহযোগিতা প্রদান করত। কিন্তু এই সিস্টেম বেশিদিন টিকে থাকেনি। কারণ, এনজিওগুলো এই ক্ষৃদ্রঋণ কার্যক্রমকে সেবা থেকে ব্যাংকিং ব্যবসায় পরিণত করেছে। এই ব্যবসায় দরিদ্র মানুষের যতটা না কল্যাণ হচ্ছে এনজিওগুলোর নিজেদের কল্যাণ তার চেয়ে বেশি হচ্ছে বলেই মনে হয়। তাই সাবেক অর্থমন্ত্রী জনাব ছাইফুর রহমান মাঝে মধ্যে বক্রস্বরে বলতেন যে, এনজিওরা ঋণের ব্যবসা ফেঁদে রকফেলারের মত আকাশচুম্বি অট্টালিকা গড়ে তুলছে, রাতারাতি ফুলে ফেপে উঠছে। শুধু সাবেক অর্থমন্ত্রীই নয়, বিষয়টি যেকোন সচেতন মানুষের কাছেই বোধগম্য। ক্ষুদ্র ঋণের কুশীলবরা আজ শুধু আকাশচুম্বি অট্টালিকাই গড়ে তুলছেনা, বহুজাতিক কোম্পানির আদলে গড়ে তুলছে নানা ধরণের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

আমি বলি, মাননীয় মন্ত্রীমহোদয়, উন্নয়নের খেলায় মিলেনিয়াম গোল করতে গিয়ে আপনিতো গলধঘর্ম হচ্ছেন; পরিসংখানের খাতায় কাটাকুটি করেও দরিদ্রের সংখ্যাটা ৫০ ভাগের নীচে নামিয়ে আনতে পাচ্ছেন না। সেই হতদরিদ্র, কপর্দকশূণ্য মানুষ যাদেরকে আপনার ব্যাংকওয়ালারা পায়েও মাড়ায়না তাদেরকে ধুলো-কাঁদা মাখা অজপাড়াগায়ে সেবা দিই বলে আমাদের কী সাধ জাগেনা একটু আকাশ ছুয়ে দেখার। আর তাতেই আপনার চোখ টাটাচ্ছে।

আবার ঐ সাংবাদিক জাতটা একবারে টেরা চোখা, সবকিছু দেখে বাঁকাচোখে। ওঁরা প্রায়ই লেখে, আমরা নাকি বন্যা-খরা, বাঁচা-মরা কিছুই মানি না, বর্গীর মতো হামলে পড়ি ঋণের কিস্তি আদায়ের জন্য। বলি কি দাদা, লেখাটা খুব সোজা, কলম চালালেই লেখা হয়ে যায়। আসুন না একবার দেখুন না ক্ষুদ্রঋণ চালিয়ে, কেমন ঠেলা। নিঃস্ব আকিঞ্চিতকর মানুষগুলোকে টাকা দিয়ে ৯৫-১০০% রিকভারি, একি চাট্টিখানি কথা। টাকা বলে কথা, কেউ কি দেয় সহজে? তাইতো একটু আঙ্গুলটা বাঁকা করতেই হয়।

মনে কেমন যেন খটকা লাগে এই ভেবে যে, ধনী বিশ্বেতো আমাদের ক্ষুদ্রঋণের মডেলের কার্যকারিতা বা প্রয়োজনীয়তা কোনটাই নেই তবে আজ আমাদের ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে সারা বিশ্বে বিশেষ করে ধনী দেশগুলোতে এত মাতামাতি চলছে কেন। এ প্রশ্নের জবাবটা আমার ক্ষুদ্র মস্তিস্কে কিছুতেই আসছে না। এই ক্ষুদ্রঋণ আমাদের দারিদ্র মোচন করে দিবে, একি সেজন্যই? মনে ঘোর সন্দেহ জাগে কারণ, ১৯৯৭ সালের ক্ষুদ্রঋণ সম্মেলন আয়োজনে টাকা ঢেলেছে বিশ্বে কৃষি ব্যবসায় দুষ্ট কোম্পানি হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে থাকা বহুজাতিক কোম্পানি মোনসান্টো। কেন!!! কারণ, ঐ সম্মেলনে মোনসান্টো গ্রামীন ব্যাংকের সাথে ৩৫০ কোটি ডলার ঋণের বিনিময়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। শর্ত ছিল, গ্রামীন ব্যাংক তার কৃষক সদস্যদের মধ্যে মোনসান্টো কোম্পানির প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিবে। আমাদের সৌভাগ্য যে, দেশের পরিবেশবাদীদের চাপে ড. ইউনুস চুক্তি থেকে নিবৃত হন।

আমাদের উন্নয়নের ভাবনায় ধনী দেশের ঘুমহারাম অবস্থা, অথচ এইতো গত ডিসেম্বরে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার হংকং মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে আমরা বর্তমানে এদেশের অর্তনীতির প্রাণপঙ্ক হয়ে উঠা পোষাক শিল্পকে বাঁচাতে আমেরিকার বাজারে আমাদের তৈরি পোষাকের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার চেয়েছিলাম (যা আমাদের ন্যায্য দাবিও বটে), কিন্তু অন্যসব গরীব দেশকে এ সুযোগ দেয়া হলেও বাংলাদেশকে দেয়া হয়নি। তাই ঘরপোড়া গরুর মতই ভয় হয় ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে এত মাতামাতি-এ আবার কোন দুরভিসন্ধি কি-না।

দুরভিসন্ধিতো অবশ্যই আছে। চৌদ্দ কোটি মানুষের এ দেশের বাজার, অথচ অর্ধেকেরও বেশী মানুষের বাস দরিদ্র সীমার নীচে। কাজেই এ বাজারে ব্যবসা করতে হলে এদের হাতে অর্থ তুলে দিতে হবে, বাড়াতে হবে ক্রয় ক্ষমতা। তা না হলে নিমের ডাল ছেড়ে ক্লোজ-আপ, সর্ষের তেল ছেড়ে সোয়াবিন আর ফেয়ার এন্ড লাভলি কিনবে কি করে। এই ক্ষুদ্র ঋণের পুরোধা গ্রামীন ব্যাংকের হাত ধরেই দরিদ্র মানুষের কাছে অত্যাধুনিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা মোবাইল ফোন পৌছে দেয়ার বাহারি প্রকল্প নিয়ে এসেছিল নরওয়ের মোবাইল কোম্পানি ইউনিনর যা আমরা দীর্ঘদিন যাবৎ জানতেই পারিনি। ভেবেছি, এটা আমাদের গ্রামীন ব্যাংকেরই কারিশমা। অথচ একটি হতদরিদ্র দেশের দরিদ্র মানুষগুলোর কাছ থেকে অবলীলায় সাত টাকা মিনিট কলচার্য নিয়ে যাচ্ছে যা আমাদের প্রতিবেশি দেশেই মাত্র ৫০/৬০ পয়সা। মাতামাতি কি এমনিতেই।

ক্ষুদ্র্ঋণ মডেল আমিও সমর্থন করি, তবে তা হতে হবে সেই গরীব মানুষদেরই নিয়ন্ত্রণে, নব্য মহাজনদের নয়। পাল্টে দিতে হবে এই নব্য মহাজনি সিস্টেম। চালু করতে হবে দরিদ্র জনগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত ক্ষুদঋণ ব্যবস্থা।

কৃষিবিদ শহীদুল ইসলাম
নির্বাহী পরিচালক, উন্নয়ন ধারা
(২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্রঋণ বর্ষ উপলক্ষে লেখা)